কুরবানির ফজিলত ও তাৎপর্য: ত্যাগের মহিমায় আল্লাহর নৈকট্য লাভ

0 Shahgonj News
ছবি: এ আই
 ইসলামি শরিয়তে কুরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাই হলো কুরবানি। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং এটি নিজের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করার প্রতীক।

 

কুরবানির ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ত্যাগের ঘটনা। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানি করার আদেশ দেন। তিনি নিঃসঙ্কোচে নিজের প্রিয় পুত্রকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই আনুগত্য ও অটল ঈমান দেখে সন্তুষ্ট হন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কবুল করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই সুন্নাত উম্মতে মুহাম্মদির জন্য চালু রয়েছে।

 

কুরবানির ফজিলত অপরিসীম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এর গুরুত্ব সম্পর্কে নানা নির্দেশনা রয়েছে।

 

১. আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তাকওয়া: আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের মনের তাকওয়া (সংকল্প ও একাগ্রতা)।” (সুরা হজ: ৩৭)। অর্থাৎ, কুরবানি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভয়।

 

 ২. পশুর পশমের বিনিময়ে সওয়াব: রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাহাবিরা প্রশ্ন করেছিলেন কুরবানির সওয়াব সম্পর্কে। তখন তিনি বলেছিলেন, "কুরবানিকৃত পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব দেওয়া হয়।" (তিরমিজি)। এটি আল্লাহর অপার করুণার বহিঃপ্রকাশ।

 

 ৩. গুনাহ মাফ: হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় এবং বান্দার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

 

 ৪. সুন্নত পালন: যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব, সে যদি তা পালন না করে, তবে সে যেন রাসুল (সা.)-এর সুন্নাত থেকে বিমুখ থাকল। রাসুল (সা.) বলেন, "যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।" (ইবনে মাজাহ)।

 

 কুরবানি শুধু ইবাদত নয়, এটি একটি বড় সামাজিক উৎসবও। কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা সুন্নত: এক ভাগ নিজেদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিন ও অসহায়দের জন্য। এর মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষগুলো ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পায়। সমাজে সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে এবং ধনীদের অন্তরে দানশীলতার শিক্ষা তৈরি হয়।

 

কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য কিছু বিষয় অত্যন্ত জরুরি:

  • নিখুঁত নিয়ত: কুরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। লোক দেখানো বা বংশমর্যাদা প্রমাণের জন্য নয়।

     

  • হালাল অর্থ: কুরবানির পশু কেনার টাকা অবশ্যই হালাল উপার্জনের হতে হবে। সুদ, ঘুষ বা হারাম পথে উপার্জিত অর্থে কুরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।

     

  • সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত পশু: কুরবানির পশু হতে হবে স্বাস্থ্যবান, ত্রুটিমুক্ত এবং বয়সের শর্ত পূরণকারী (যেমন: গরু দুই বছর, ছাগল এক বছর)।

     

    কুরবানি আমাদের শেখায় কীভাবে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করতে হয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি আমরা কুরবানির সেই ত্যাগের স্পৃহা ধরে রাখতে পারি, তবেই আমাদের জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে। আসুন, এবারের কুরবানি হোক আমাদের ভেতরের অহংকার, হিংসা ও লোভ বিসর্জনের মাধ্যম। মহান আল্লাহ আমাদের সবার কুরবানি কবুল করুন এবং আমাদের ঈমানকে মজবুত করুন। 

 

 

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.